Friday , 20 September 2019
এই মাত্র পাওয়া
Home » সমগ্র বাংলাদেশ » ‘আ’লীগ ফের ক্ষমতায় এলে দেশে দারিদ্র্য থাকবে না’

‘আ’লীগ ফের ক্ষমতায় এলে দেশে দারিদ্র্য থাকবে না’

নিজস্ব প্রতিবেদক, সিলেট : 

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘নৌকা’ প্রতীকে ভোট চেয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘‘আওয়ামী লীগ ফের ক্ষমতায় এলে দেশে দারিদ্র্য বলে কিছু থাকবে না। আমরা এ দেশকে উন্নত ও সমৃদ্ধ সোনার বাংলা হিসেবে গড়তে চাই। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে জনগণের কল্যাণ এবং উন্নয়ন হয়।’’
তাই উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে নৌকায় ভোট দিতে ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
শনিবার বিকেলে সিলেটের আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে আওয়ামী লীগ আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় বক্তৃতাকালে প্রধানমন্ত্রী এ সব কথা বলেন। জনসভায় ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের ভোট চাওয়ার পাশাপাশি সিলেটসহ দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন, পদ্মা সেতু নির্মাণ এবং নির্বাচিত হলে দেশ নিয়ে তাঁর পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।
সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অ্যাডভোকেট লুৎফুর রহমানের সভাপতিত্বে জনসভায় প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘‘নৌকা উন্নয়নের প্রতীক। আর ধানের শীষ দুর্নীতি-অগ্নিসন্ত্রাস আর যুদ্ধাপরাধীদের প্রতীক। বিএনপি-জামায়াত ফের ক্ষমতায় এলে দেশ ধ্বংস করে দেবে। তারা দেশের সকল অর্জন নস্যাত করে দেবে।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে দেশের উন্নয়ন হয়, দারিদ্র্যের হার কমে। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এখন ৮.৬ ভাগে উন্নীত করেছি। আমরা সকলের জন্য বিনা পয়সায় বই দিচ্ছি। ২ কোটি ৪ লাখ শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দিচ্ছি। মায়ের মোবাইল ফোনে উপবৃত্তির টাকা দিচ্ছি।’’
তিনি বলেন, ‘‘সারা দেশের উন্নয়নের ছোঁয়া সিলেটেও লেগেছে। সিলেটসহ সারা দেশে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন করা হয়েছে। ১৬শ’ মেগাওয়াট থেকে বিদ্যুতে উৎপাদন এখন দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার মেগাওয়াটে। হাওর-বাওড়ে সোলার প্যানেলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আজ মানুষ বিদ্যুৎ পাচ্ছে, ভাগ্য পরিবর্তন হচ্ছে। সিলেটে শ্রীহট্ট অর্থনৈতিক অঞ্চল করে দিচ্ছি। এখানে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ হবে। প্রবাসী যারা আছেন, তারাও বিনিয়োগ করতে পারবেন। সকলের বিনিয়োগের সুযোগ করে দিচ্ছি, যেখানে কর্মসংস্থান হবে।’’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘চায়ের নিলাম কেন্দ্র চট্টগ্রাম থেকে সিলেটে আনা হয়েছে। চা শ্রমিকরা সবসময় নৌকায় ভোট দেয়। তাদের ধন্যবাদ। তাদের উন্নয়নে আমরা ব্যাপক কাজ করেছি। চা শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য স্কুলের ব্যবস্থা করেছি, চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছি। আমরা সারা দেশে কমিউনিটি ক্লিনিক করে দিয়েছি। মা-বোনেরা এখন বাড়ির পাশে চিকিৎসা নিতে পারেন।’’
তিনি বলেন, ‘‘সিলেটে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। সিলেট বিভাগসহ দেশের প্রতিটি জেলায় সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হবে। সিলেট-ঢাকা চারলেন সড়ক দ্রুত শুরু হবে। জলাবদ্ধতা যাতে না হয়, তার ব্যবস্থা করেছি। সুপেয় পানির ব্যবস্থা করে দিয়েছি, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম করে দিয়েছি। দৃষ্টিনন্দন স্টেডিয়াম এখন অনেকেই দেখতে আসে।’’
সিলেটে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর আরো আধুনিকায়নের পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাজা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘খালেদার বিরুদ্ধে তার প্রিয় ব্যক্তিরাই মামলা করেছেন। তার বিরুদ্ধে আমি বা আওয়ামী লীগ মামলা দেয়নি। সেই মামলা ১০ বছর ধরে চলে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। একুশ আগস্ট গ্রেনেড হামলা করে আইভি রহমানসহ ২৪ নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়। আওয়ামী লীগের অনেক নেতা স্প্রিন্টার নিয়ে জীবন কাটাতে হচ্ছে। সাজাপ্রাপ্ত তারেক রহমান বিদেশে বসে কলকাঠি নাড়ছে।’’
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিএনপির মনোনয়ন বাণিজ্যের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘‘নির্বাচনে তারা একেক আসনে চার-পাঁচজনকে নমিনেশন দিয়েছে। পরে অকশনে দিয়েছে। যে বেশি টাকা দিয়েছে, তাকে মনোনয়ন দিয়েছে।’’
তিনি বলেন, ‘‘বিএনপির নমিনেশনের ক্ষেত্রে তারেক রহমান লন্ডনে বসে নাটাই ঘুরিয়েছে। এ কারণে ইনাম চৌধুরীর মতো ব্যক্তি আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন। আমি তাকে আওয়ামী লীগে স্বাগত জানিয়েছি।’’ এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ প্রধান বলেন, ‘‘নির্বাচনে নমিনেশন বাণিজ্যের কারণে এখন তাদের ‘ছ্যাড়াব্যাড়া’ অবস্থা। কেউ তাদের বিশ্বাস করে না।’’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘‘আল্লাহ দিন দিলে সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে ধরে এনে বিচার কার্যকর করবো।’’
প্রধানমন্ত্রী গত ৩০ জানুয়ারি সিলেট সফরের আলোকপাত করে বলেন, ‘‘গত জানুয়ারিতে সিলেটের এই মাঠ থেকে নির্বাচনী প্রচার শুরু করেছিলাম। আবার আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। বিজয়ের মাসে আপনাদের সামনে এসেছি। আর আজ নৌকা মার্কার প্রার্থীদের জন্য ভোট চাইতে এসেছি।’’ তিনি বলেন, ‘‘নৌকা হচ্ছে মানুষের বিপদের বন্ধু। হযরত নুহ (আ:) নৌকার মাধ্যমে বিপদগ্রস্ত মানুষকে সাহায্য করেছিলেন। নৌকার মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষ পেয়েছে স্বাধীনতা, মাতৃভাষা, উন্নয়ন।’’
কওমী সনদের স্বীকৃতির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দাওরায়ে হাদীসকে মাস্টার্সের সমমান দেওয়া হয়েছে। মাদ্রাসার ছাত্ররা যাতে সনদ নিয়ে দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থানে নিয়োজিত হতে পারে, সেজন্যই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।’’
সৌদি সরকারের অর্থায়নে সারা দেশে ৫৬০টি মডেল মসজিদ কাম ইসলামিক সেন্টার স্থাপন করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘তরুণরাই শক্তি। আমরা তরুণদের মেধা, শক্তি-মননকে কাজে লাগিয়ে উন্নততর দেশ গড়তে চাই। ২০০৯-১৮ সাল মেয়াদে বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত হয়েছে।’’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। দুর্নীতি করে দেশের সুনাম ক্ষুণ্ন করেছে। এতিমখানার টাকা দুর্নীতির কারণে খালেদা জিয়া কারাভোগ করছেন। বিএনপি মানুষ পুড়িয়ে মারতে পারে। ২০১৪ সালে আন্দোলনের নামে মানুষ মেরেছে।’’
নিজেদের অর্থে পদ্মা সেতু নির্মিত হওয়ায় সারা বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘‘পদ্মা সেতুতে বিশ্ব ব্যাংকের দুর্নীতির অভিযোগ ভুয়া প্রমাণিত হয়েছে। আমরা নিজের ভাগ্য না, বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য গড়তে চাই।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘আমরা ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে মোবাইল ফোন বেসরকারি খাতে উন্মুক্ত করেছি। মনোপলি ব্যবসা ভেঙে দেওয়ায় আজ সবার হাতে হাতে ফোন। সারা দেশে ইন্টারনেট চালু করেছি। স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১ উৎক্ষেপণ করেছি। সবাই এখন বিশ্বকে দেখতে পারে, আত্মীয়স্বজনকে দেখতে পারে। মোবাইল ফোনে আমরা টু জি থেকে থ্রি জি, থ্রি জি থেকে ফোরজিতে চলে এসেছি। আগামীতে আমরা ফাইভ জি চালু করবো।’’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘‘বাংলাদেশ বিশ্বে যে সম্মান অর্জন করেছে, তা ধরে রাখতে হবে। যে সম্মান বিশ্বে পায়, তার জন্য নৌকায় ভোট দিতে হবে। আমি নৌকা প্রতীকে ভোট চাইতে এসেছি। শুধু নৌকা প্রতীক নয়, আমরা মহাজোটের সকল প্রার্থীর জন্য ভোট চাইতে এসেছি।’’
জনসভায় সিলেট বিভাগের ১৯টি আসনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের সকল প্রার্থীকে পরিচয় করিয়ে দেন শেখ হাসিনা। তিনি মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে লাঙ্গল প্রতীকধারীদেরও পরিচয় করিয়ে দেন, তাদের পক্ষে ভোট চান।
এ সময় রসিকতা করে বলেন, ‘‘আপনারা লাঙলে ভোট দেন। আমরা পরে তাদের নৌকায় তুলে নেব। যেভাবে ধানের শীষের এম এম শাহিনকে নৌকায় তুলে নিয়েছি। যিনি বিকল্পধারা থেকে মৌলভীবাজার-২ আসনে নির্বাচন করছেন।’’
সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের সভাপতিত্বে জনসভায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ, জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, আহমদ আলী, সিলেট-১ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ড. এ কে আবদুল মোমেন, সিলেট-৩ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী কয়েস, সিলেট-৪ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ইমরান আহমদ, সিলেট-৫ আসনের প্রার্থী হাফিজ আহমদ মজুমদারসহ কেন্দ্রীয় নেতারা বক্তব্য দেন।
জনসভায় যোগ দিতে শনিবার সকাল থেকে বিভাগের বিভিন্ন উপজেলা থেকে নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে আলীয়া মাদ্রাসা মাঠে আসেন। তাদের ‘নৌকা-নৌকা’ স্লোগানে মুখর হয়ে উঠে সিলেটের রাজপথ। দুপুর থেকে আসা খণ্ড খণ্ড মিছিলের সব স্রোত গিয়ে মিলে মাদ্রাসা মাঠে। ফলে জনসভা শুরুর আগেই মাঠ লোকে একাকার হয়ে যায়।
বিকেল  ৩টা ১৪মিনিটের সময় সভাস্থলে এসে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। পরে ৪টার দিকে তিনি বক্তব্য দেওয়া শুরু করেন। প্রায় ৩৪ মিনিটের বক্তব্য শেষে তিনি সিলেটের ১৯টি আসনের আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন।
এর আগে সকাল ১০টা ৪৭মিনিটে বিমানের বিশেষ বিজি-১২১১ ফ্লাইটযোগে সিলেটে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। তিনি সিলেট পৌঁছে হযরত শাহজালাল (রহ.), শাহপরাণ (রহ.) ও হযরত গাজী বুরহান উদ্দিনের মাজার জিয়ারত করেন। পরে বিশ্রাম ও মধ্যাহ্নভোজ করতে সিলেট সার্কিট হাউসে যান।
সফরসূচি অনুসারে জনসভা শেষ করে সন্ধ্যা সোয়া ৬টায় বিমানের ফ্লাইটে ঢাকার ফিরে যান প্রধানমন্ত্রী। চলতি বছরে এটি প্রধানমন্ত্রীর সিলেটে দ্বিতীয় সফর। এর আগে ৩০ জানুয়ারি সিলেটের আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে জনসভায় অংশ নিয়েছিলেন তিনি। ওই জনসভা থেকে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক  প্রচার শুরু করেন প্রধানমন্ত্রী।

Leave a Reply